দুর্গাপূজা আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতিফলন

দুর্গাপূজা  আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতিফলন

দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতিফলন। প্রার্থনা, প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে এই সম্প্রীতি আরও গভীর হয়। আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিটি পরিবার নিশ্চিন্ত মনে উৎসবে অংশ নেবে, শিশুরা আনন্দে মণ্ডপে যাবে এবং প্রবীণেরা নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার পালন করবেন। এই প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই বিজিবি সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিজিবি একটি সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এলাকার প্রয়োজন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হবে। 


পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ২ হাজার ৭২৭টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় বিজিবি নিয়োজিত থাকবে। এর মধ্যে সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে ১ হাজার ৪২৫টি, ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের তিন কিলোমিটারের মধ্যে ১ হাজার ১১৯টি এবং দুর্গম ও দূরবর্তী এলাকার ১৮৩টি পূজামণ্ডপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সীমান্তবর্তী পূজামন্ডপগুলোর নিরাপত্তায় বিজিবি মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। অন্যান্য দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা সহায়তা দেবে। পরিস্থিতির প্রয়োজনে সহায়তা জোরদার করার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। আগামী ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বিজিবি সদস্যরা দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মণ্ডপগুলোর সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও রেকি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। যাতায়াতের পথ, স্থানীয় পরিবেশ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজানো হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত যথাস্থানে পৌঁছানো যায়। দুর্গম ও দূরবর্তী এলাকার মন্ডপগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় নিরাপত্তা সহায়তা সহজ করতে ১৮টি বেইজ ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে ছঁরপশ জবধপঃরড়হ ঋড়ৎপব-সহ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। দূরত্ব বা দুর্গমতার কারণে কোন এলাকার মানুষ যেন নিরাপত্তা সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, এটাই আমাদের লক্ষ্য। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ে ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের মাঝে যোগাযোগ সহজ হবে। প্রস্তুতি যাচাই করতে মহড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ইতিমধ্যে সদর দপ্তর ও মাঠপর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে, যাতে প্রাপ্ত তথ্য দ্রুত মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ঢাকা মহানগরীতে বিজিবির দায়িত্বের পরিধি সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে টহল, নিরাপত্তা সহায়তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে। পূজা চলাকালে গুজব, অপতথ্য ও সাম্প্রদায়িক উসকানির বিষয়ে আমাদের বিশেষ সতর্কতা বজায় থাকবে। একটি পুরোনো ছবি, অসম্পূর্ণ ভিডিও কিংবা যাচাই না করা বক্তব্য উদ্বেগ ও ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে পারে। তাই অনুরোধ, সংবেদনশীল কোনো তথ্য প্রচারের আগে সত্যতা যাচাই করুন। সন্দেহজনক কোনো বিষয় নজরে এলে দ্রুত নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্প, পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনকে জানান। পূজা উদযাপন কমিটি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিও অনুরোধ, দায়িত্বপ্রাপ্তদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোন উদ্বেগ থাকলে আগেই অবহিত করুন। সময়মতো পাওয়া একটি তথ্যও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিজিবি সদস্যরা প্রযোজ্য আইন এবং অনুমোদিত নির্দেশনা অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবেন। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা, সংযম বজায় রাখা এবং মানুষের সঙ্গে আচরণে সৌজন্য ও সহমর্মিতা দেখানোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আপনাদের মাধ্যমে সনাতন ধর্মের ভাইবোনদের আশ্বস্ত করতে চাই, আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় আচার পালন করুন, পরিবার নিয়ে আনন্দের সঙ্গে উৎসবে অংশ নিন। নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী ও প্রশাসন আপনাদের পাশে রয়েছে। সকলের সহযোগিতায় পূজার প্রতিটি দিন আপনাদের জন্য শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর থাকবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 


এই নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ এবং অপরাধীদের তৎপরতা প্রতিরোধে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পূজার বিশেষ দায়িত্বের পাশাপাশি বিজিবির নিয়মিত অভিযান ও সীমান্ত নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। গত ০১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত বিজিবির বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ০২ হাজার ৮৬ কোটি টাকা মূল্যের চোরাচালানি মালামাল জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য, স্বর্ণ, বস্ত্র ও প্রসাধনীসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। এসব অভিযান দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বৈধ ব্যবসার পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে। মাদক প্রতিরোধ আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এ বছর ০১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ০২ কোটি ৬০ লাখের বেশি ইয়াবা, ৪০ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস এবং প্রায় ১৬ হাজার কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ০৯ কেজি হেরোইন, ২৮ হাজার বোতল ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদকও জব্দ হয়েছে। এসব মাদক চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত মোট ১ হাজার ৫৩৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব মাদকের প্রতিটি চালানের সঙ্গে কোন তরুণের ভবিষ্যৎ এবং কোন পরিবারের শান্তি বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা জড়িয়ে থাকে। এই উপলব্ধি নিয়ে আমাদের সদস্যরা দিন রাত দায়িত্ব পালন করছেন। একই সময়ে অবৈধ অস্ত্র বিরোধী অভিযানে ৭৮টি পিস্তল, ০৭টি রাইফেল ও ০১টি এসএমজিসহ ০৭ টি গ্রেনেড, ১২ টি মাইন এবং ৩ হাজার ২১৩ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য চোরাচালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ০১ হাজার ৯৫৭ জনকে আটক করে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। মানবপাচার প্রতিরোধে নারী ও শিশুসহ ৪২ জনকে পাচারকালে উদ্ধার এবং ২০ জন মানবপাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। প্রতিটি উদ্ধার একজন মানুষকে নিরাপদ জীবনে ফেরার সুযোগ দেয় এবং একটি পরিবারকে স্বজন ফিরে পাওয়ার আশ্বাস দেয়। পাচার প্রতিরোধে সীমান্তের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চলছে। 


জোরপূর্বক পুশ-ইনের অপচেষ্টা মোকাবিলায় বিজিবি দৃঢ়তা, সংযম ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছে। ০১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ২৩টি সীমান্তবর্তী জেলায় ১৮২ টি ঘটনায় ০১ হাজার ২৭৫ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ-ইনের অপচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এ বিষয়ে নিরবিচ্ছিন্ন নজরদারি, টহল এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। 


কৃষি উৎপাদন ও প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সুরক্ষায় সার, জ্বালানি ও ভোজ্য তেল পাচার প্রতিরোধেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ১৫৮ মেট্রিক টন রাসায়নিক সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ০১ লাখ ০২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল এবং প্রায় ১৫ হাজার লিটার ভোজ্য তেল জব্দ হয়েছে। এসব দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে পালনে আধুনিক নজরদারি সরঞ্জাম, ড্রোন ও রাতের পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্তের মানুষের চিকিৎসাসেবা, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মানুষের আস্থা ও সহযোগিতাকে আমরা সীমান্ত সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করি।


সীমান্তের নিরাপত্তা, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং মানুষের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষায় বিজিবি দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। এই প্রচেষ্টায় আপনাদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও গঠনমূলক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসুন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শারদীয় দুর্গাপূজাকে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করে তুলি। মানুষ নিশ্চিন্তে প্রার্থনা করুক, পরিবার নিয়ে উৎসবে অংশ নিক এবং আনন্দ শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরুক এই আমাদের প্রত্যাশা। সনাতন ধর্মাবলম্বী সকল ভাইবোনকে আবারও শারদীয় দুর্গাপূজার আন্তরিক শুভেচ্ছা। সবার জীবন শান্তি, আনন্দ ও সম্প্রীতিতে পরিপূর্ণ হোক।

পাঠকের মতামত ০

লগইন করুন
মতামত শালীন ও প্রাসঙ্গিক রাখুন।

এই সংবাদে এখনও কোনো মতামত নেই।

প্রথম পাঠক হিসেবে আপনার মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করুন!